দ্বীনিয়াত কি?

দ্বীনিয়াত

দ্বীনিয়াত কি?

দ্বীনিয়াত হলো সাধারণ মানুষকে দীন শেখানোর একটি কার্যক্রম। সাধারণ মানুষ বলতে বোঝানো হয়েছে যারা মাদরাসা-মসজিদের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে দীনি শিক্ষা অর্জন করছে না। বরং তারা সাধারণ শিক্ষায় গ্রহণ করছে বা করেছে। অথবা যারা কোনো প্রকার শিক্ষাই গ্রহণ করে নি।

বিশ্লেষন করে দেখা গেছে বর্তমান বিশ্বে মুসলমানের ৯৮ ভাগই এ শ্রেণির অন্তর্ভূক্ত। ৯৮ ভাগ মুসলিমকে দীনি শিক্ষা প্রদানের একটি বিশেষ কারিকুলামের নাম দ্বীনিয়াত। অন্যভাবে বললে, দ্বীনিয়াত শিক্ষা কেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক সংস্থা। শিক্ষা পরিচালনা, শিক্ষা নিয়ে গবেষণা ও শিক্ষা উপকরণ (বই-পুস্তক) তৈরি ও প্রকাশ করে থাকে।

দ্বীনিয়াতের চিন্তা ও যাত্রা যেভাবে শুরু হয়েছিল:

দ্বীনিয়াতের যাত্রা শুরু হয় ১৯২৫ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায়। তখন দক্ষিণ আফ্রিকার আলেমরা দেওবন্দের সাথে যোগাযোগ করে স্কুলগামী ছাত্র-ছাত্রিদের দ্বীন শিখার আয়োজন করে। দক্ষিণ আফ্রিকার কারিকুলামটির নাম তাসহিল।

ভারতের একদল মুসলিম দক্ষিণ আফ্রিকায় হিজরত করেন। হিজরত করার পর তারা দেখতে পান সেখানে মুসলিম শিশুদের জন্য ইসলামি শিক্ষার কোনো ব্যবস্থা নেই।

তখন তারা সাধারণ শিক্ষা লাভের পাশাপাশি মুসলিম শিশুরা যেনো ইসলামি শিক্ষা লাভ করতে পারে সেজন্য এ কারিকুলাম চালু করেন।

দক্ষিণ আফ্রিকার স্থানীয় আলেম উলামা দারুল উলুম দেওবন্দের পরামর্শে এ সিলেবাস প্রণয়ন করেন। যুগে যুগে উলামায়ে কেরামই এ শিক্ষা কারিকুলামের সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন।

অবশ্য এরপর এ শিক্ষা কারিকুলামের ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। বর্তমানে বিশ্বের ৪০টি দেশে দ্বীনিয়াতের স্বীকৃত কাযক্রম রয়েছে এবং অস্বীকৃতভাবে প্রায় ৭০টি দেশে এ শিক্ষা কারিকুলাম চলছে। দ্বীনিয়াতের সিলেবাসভূক্ত বইগুলো প্রায় ৩০টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে।

দ্বীনিয়াতের কর্মপদ্ধতি:

দ্বীনিয়াতের শিক্ষা কারিকুলাম ৩ স্তর বিশিষ্ট। ১. প্রাইমারি, ২. সেকেন্ডারি, ৩. এ্যাডভান্স। এ তিন স্তরের শিক্ষা কারিকুলাম দুইভাবে পরিচালিত হয়।
এক. স্কুলের সাধারণ পাঠ্যসূচির সাথে।

দুই. সকাল বেলার মক্তবে। স্কুলের সাথে পারিচালিত হলে সময় লাগে ১৫ বছর। আর মক্তবে পড়ানো হলে সময় লাগে ২ বছর করে ৬ বছর। তবে উভয় ক্ষেত্রে দ্বীনিয়াত প্রতিদিন সময় নেয় ১ ঘণ্টা করে।

দ্বীনিয়াতের সিলেবাস:

দ্বীনিয়াতের সিলেবাসে শিক্ষার্থীদের ৫টি বিষয় শেখানো হয়। কুরআন, হাদিস, আকাইদ-মাসায়েল, ইসলামি তরবিয়্যাত ও আরবি ভাষা। আমরা শিক্ষার্থীদের কুরআন শরিফ দেখে পড়ানো শেখানোর পাশাপাশি ২৩ সুরা মুখস্থ করাই।

৪০টি হাদিস মুখস্থ করানোর পাশাপাশি বিষয়ভিত্তিক হাদিস মুখস্থ করানোর হয়।

বিশুদ্ধ আকিদা-বিশ্বাস শেখানো হয়। নামাজ, রোজা, হজ্জ, জাকাতসহ মুসলমানের চব্বিশ ঘণ্টার জীবনে প্রয়োজনীয় সব বিষয়ে মাসায়েল ও দোয়াসমূহ শেখানো হয়। ইসলামি তরবিয়্যাত হলো, শিশুদের জীবনে ইসলামি শিক্ষা ও শিষ্টাচার প্রোথিত করে দেয়া। তার মন-মগজে ইসলাম সেট করে দেয়া।

দ্বীনিয়াতকে বলা যায় একটি সম্প্রসারিত মক্তব।

একটা সময় আমাদের দেশের প্রতিটি মসজিদে একটা করে মক্তব ছিলো। শিশুরা সকালে স্কুলে যাওয়ার আগে মক্তবে দীন শিখতো। কিন্তু এখন সে মক্তব হারিয়ে যাচ্ছে। সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থা এমনভাবে সাজানো হয়েছে যেনো শিশুরা সকালে মক্তবে পড়তে না পারে। ফলে মক্তবও থাকছে না আর শিশুরা দীন শিখতে পারছে না।

আমাদের প্রচেষ্টা ছিলো কুরআনি মক্তব ছড়িয়ে দেয়ার। যেনো শিশুরা দীনের মৌলিক শিক্ষা লাভ করতে পারে।

হারিয়েছে যাচ্ছে কুরআনি মক্তব:

দুটি কারনে কুরআনি মক্তব হারিয়ে যাচ্ছে। এক. আমাদের কিছু দুর্বলতা রয়েছে। আমাদের মসজিদভিত্তিক কুরআনি মক্তবগুলোর সিলেবাস, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও পাঠদান পদ্ধতি নির্ধারিত নয়। প্রত্যেক শিক্ষক তার মনমতো পড়ান, পরিচালনা করেন।

দুই. পরিবেশের অবনতি। আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশের অবনতির কারণে শিশুরা মক্তববিমুখ হচ্ছে।

পরিবেশগত কারণেও অনেকে শিশুদের মক্তবে দেয় না। আমরা চাচ্ছি উভয় ধরনের প্রতিকূলতা কাটিয়ে উঠতে।

আমাদের পরিচালিত দ্বীনিয়াত মক্তবগুলোর নির্ধারিত সিলেবাসে আছে, নির্ধারিত ব্যবস্থপনায় চলে এবং পাঠদান পদ্ধতিও রয়েছে। আমরা শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকি।

এখন দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার কারণে সকালে শিশুদের মহল্লার মসজিদে যাওয়ার সুযোগ হয় না।
এজন্য আমরা বাচ্চাদের সময়ের সাথে সময় মিলিয়ে পাঠদান করি। শিক্ষকের সময় অনুযায়ী শিক্ষার্থীকে পাঠদান নয়; শিক্ষার্থীর সময় অনুযায়ী তাকে পাঠদান করা হয়। আর আমরা বলি শিশুকে ঘরের পরিবেশ থেকে উত্তম পরিবেশে শিক্ষা দান করবো।

বাংলাদেশে দ্বীনিয়াতের কার্যক্রম শুরু:

সব আয়োজন করে দ্বীনিয়াতের কাজ শুরু করতে তিন বছর সময় লেগে যায়। ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকার মিরাজনগর মাদরাসায় দ্বীনিয়াতের কাজ শুরু হয়। বর্তমানে বাংলাদেশে ছয়শো সেন্টারে ১২ হাজার শিশু পড়ছে।

দ্বীনিয়াতে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেয়ার পদ্ধতি:

কোথাও যদি ৫০ শিক্ষক এক হতে পারেন। তাহলে দ্বীনিয়াতের প্রধান কার্যালয় থেকে টিম যেয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে আসে। আর তা না হলে নির্ধারিত সময়ে দ্বীনিয়াতের প্রশিক্ষণ সেন্টারে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়।

শিক্ষক প্রশিক্ষণে শিশু মনোবিজ্ঞানের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়। শিশুদের মনোভব বুঝে যেনো তাদের শিক্ষা দিতে পারে।

শিশু মনোবিজ্ঞান:

শিশুদের মেধা-বুদ্ধি অপরিপক্ক। তারা আনন্দপ্রায়াসী। শিশুদের পাঠদানের সময় তাদের মনের চাহিদা ও মেধার ধারণ ক্ষমতা বিবেচনায় রাখতে হবে। আমরা জানি শিশুরা সংগিত পছন্দ করে। এজন্য দ্বীনিয়াতের বইতে ১০টি সংগিত রাখা হয়েছে। তাদের মুখস্থ করানো হয় এবং সুরও শেখানো হয়।

আমরা আসা করছি আগামী কয়েক বছরে বাংলার ঘরে ঘরে দ্বীনিয়াত পৌঁছে যাবে ইনশাল্লাহ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *